অক্ষয়চন্দ্র সরকার (১৮৪৬–১৯১৭)
ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক অক্ষয়চন্দ্র সরকার ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও সমাজসচেতন ব্যক্তিত্ব। রায়বাহাদুরের পুত্র হয়েও তিনি ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রবল সমর্থক। দেশীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবন, স্বদেশী চিন্তা ও স্বায়ত্তশাসনের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষে তিনি আজীবন সক্রিয় ছিলেন।
অক্ষয়চন্দ্র সরকার জন্মগ্রহণ করেন ১১ ডিসেম্বর ১৮৪৬ সালে বর্তমান হুগলি জেলার চুঁচুড়ার কদমতলায়। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন খ্যাতনামা কবি ও সাহিত্যিক রায়বাহাদুর গঙ্গাচরণ সরকার।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয় হুগলি কলেজিয়েট স্কুলে এবং পরবর্তীতে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে অধ্যয়ন করেন। কর্মজীবনে প্রথমে বহরমপুরে এবং পরে চুঁচুড়ায় ওকালতি পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
প্রথম যৌবনেই তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। ১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শনের প্রথম সংখ্যায় তাঁর ‘উদ্দীপনা’ নামক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যা তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৮৭২ সালে তিনি মাসিক নবজীবন এবং ১৮৭৩ সালে সাপ্তাহিক সাধারণী পত্রিকা প্রকাশ করেন। নবজীবন পত্রিকাটি ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মতো খ্যাতনামা সাহিত্যিকরা নিয়মিত লেখালেখি করতেন। রামেন্দ্রসুন্দরের প্রথম বাংলা রচনাও এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়।
চুঁচুড়া থেকে প্রকাশিত সাধারণী পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক আলোচনা ও হিন্দুসমাজের ভিত্তি দৃঢ় করা। এই পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু প্রমুখ প্রথম সারির সাহিত্যিকের লেখা প্রকাশিত হতো।
১৮৭৪ সালে তিনি যুক্তাক্ষরবর্জিত শিশুপাঠ্য কাব্য ‘গোচারণের মাঠ’ এবং একই বছরে ‘শিক্ষানবীশের পদ্য’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সারদাচরণ মিত্রের সহযোগিতায় তিনি ‘প্রাচীন কাব্যসংগ্রহ’ নামে একটি কাব্যসংকলন সম্পাদনা করেন। ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৭ সালের মধ্যে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত এই সংকলনে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, মুকুন্দ চক্রবর্তী প্রমুখ মধ্যযুগীয় কবিদের কাব্য স্থান পায়।
যদিও তিনি কবিতাও রচনা করেছেন, তবে কবিতার তুলনায় গদ্যরচনাতেই তাঁর খ্যাতি অধিক। ১৮৭৪ সালে রচিত ‘সমাজ সমালোচনা’ এবং মৃত্যুর পরে ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ‘রূপক ও রহস্য’ তাঁর গদ্যরচনার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘বঙ্গভাষার লেখক’ গ্রন্থের ‘পিতাপুত্র’ প্রবন্ধে তিনি পিতা গঙ্গাচরণ সরকার ও নিজের সাহিত্যজীবনের কথা তুলে ধরেন।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে কবি হেমচন্দ্র, সংক্ষিপ্ত রামায়ণ, মোতিকুমারী, মহাপূজা, সনাতনী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি রেন্ট বিল ও এজ অব কনসেন্ট বিল (অ্যাক্ট–১০)-এর বিরুদ্ধে প্রবল ব্রিটিশ-বিরোধী অবস্থান নেন এবং স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের সমর্থক ছিলেন। যদিও আদর্শগতভাবে তিনি কংগ্রেসি মধ্যপন্থী ছিলেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের ষষ্ঠ অধিবেশনের মূল সভাপতি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহ-সভাপতি এবং ভারতসভার প্রথম যুগ্ম সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ১৮৮৬ সালের অধিবেশনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। রায়তদের স্বার্থরক্ষায়ও তিনি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন।
সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাবশিষ্য হলেও বঙ্কিমচন্দ্রের মতো দৃঢ়তা ও ঋজুতা তাঁর রচনায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
তিনি ২ অক্টোবর ১৯১৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
Read more